সারাদেশ

৮০ পেরিয়েও গাছ লাগানোর নেশা ছাড়েননি কার্তিক

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে ৮০ বছর বয়সেও গাছ লাগিয়ে যাচ্ছেন কার্তিক পরামানিক। পাঁচজন শ্রমিক নিয়ে এক দিনে লাগালেন ৬০টি মেহগনি; এবারের লক্ষ্য ২০০ গাছ।

৩ মিনিটে পড়ুন
BartaPrerok৫ দিন আগে · ২৮ অক্টোবর ২০২৬
শ্রমিকদের সঙ্গে নিয়ে গাছ লাগাচ্ছেন কার্তিক পরামানিক
শ্রমিকদের সঙ্গে নিয়ে গাছ লাগাচ্ছেন কার্তিক পরামানিক। গতকাল সোমবার দুপুরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা ইউনিয়নের শ্যামপুর-ডাকনিপাড়া সড়কে ছবি: প্রথম আলো

শরীর আর আগের মতো নেই কার্তিক পরামানিকের। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী বয়স ৮০ বছর, যদিও তাঁর দাবি, বয়স আরও দুই-তিন বছর বেশি। একসময়ের হালকাপাতলা শরীর এখন ভারী, চোখমুখ ফোলা ফোলা। দুই বছর আগে স্ত্রীর মৃত্যুর পর মনটাও ভেঙে পড়েছে। আগের মতো দ্রুত হাঁটতে পারেন না, কৃষিকাজ ছেড়ে দিয়েছেন। তবে বাড়ির পাশের নার্সারিতে চারা তৈরি আর পরিচর্যা চালিয়ে যান। তাঁর নার্সারিতে বট, পাকুড়, মেহগনি ও শিমুলের শতাধিক চারা আছে; গাছ লাগানোর মৌসুমে নিজেই মাঠে নামেন।

গতকাল সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পাঁচজন শ্রমিক নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা ইউনিয়নের শ্যামপুর-ডাকনিপাড়া সড়কে গাছ লাগিয়েছেন কার্তিক। বেলা ১১টার দিকে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ৬০টি মেহগনিগাছ লাগানো হয়েছে। প্রতিটি চারার পাশে বাঁশের খুঁটি পুঁতে বেঁধে দেওয়া হয়েছে, দেওয়া হয়েছে পানিও। কার্তিক বলেন, এর আগে শ্রমিক না পেয়ে ছোট ছেলে সনাতনকে নিয়ে দুই দিনে রামনাথ পাড়ার সড়কে ৩০টি গাছ লাগিয়েছিলেন; এবার মোট ২০০ গাছ লাগাবেন।

ছেলের চোখে

১১ অক্টোবর দুপুরে শিবগঞ্জের তারাপুর ঠুটাপাড়ার কয়েক কিলোমিটার দূরে মাধনগর সড়কে গাছ লাগাচ্ছিলেন কার্তিক ও তাঁর ছোট ছেলে সনাতন প্রামানিক। ছোটবেলা থেকেই তিনি বাবার সঙ্গে গাছ লাগান। সনাতন জানান, দুই বছর আগে মা গীতা রানী প্রামানিক মারা যাওয়ার পর তাঁর বাবা অনেক ভেঙে পড়েন, শরীরও শক্তি হারাতে থাকে, মাঝেমধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েন। সনাতন বলেছিলেন, বাবার আর গাছ লাগানোর দরকার নেই, তাঁর হয়ে তিনিই লাগাবেন। কিন্তু কার্তিক শোনেননি—গাছ লাগানো তাঁর নেশা, এটা তিনি ছাড়তে পারবেন না।

শ্যামপুর-ডাকনিপাড়া সড়কের দুই পাশে কার্তিক পরামানিকের লাগানো মেহগনি চারা
সড়কের দুই পাশে এক দিনে ৬০টি মেহগনিগাছ লাগিয়েছেন কার্তিক পরামানিক। গতকাল সোমবার দুপুরে শিবগঞ্জের শ্যামপুর-ডাকনিপাড়া সড়কে ছবি: প্রথম আলো

১০ বছর বয়সে লাগানো পাকুড়গাছ

কার্তিকের কাছে গেলে তিনি প্রতিবারই বাড়ির কাছে শ্যামপুর গ্রামের মোড়ে একটি পাকুড়গাছের কাছে নিয়ে যান। ১০ বছর বয়সে প্রথম এ গাছটি লাগিয়েছিলেন তিনি; এখন বিশাল ছায়াবৃক্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর প্রথম কীর্তির সাক্ষী হয়ে। কার্তিকের স্মৃতিচারণ—একসময় এ এলাকা ছিল ধু ধু বালুতে ভরা; বাতাসে চোখমুখ বালুতে ভরে যেত, তপ্ত রাস্তায় খালি পায়ে হাঁটা যেত না। বাবার মুখে শোনা কথাটি তাঁর মনে গেঁথে আছে: গয়া-কাশী তীর্থে গিয়ে যে পুণ্য হবে, তার চেয়ে বেশি পুণ্য পথের পাশে ছায়াবৃক্ষ লাগালে। সেই কথা শুনেই গাছ লাগাতে শুরু; ঝড়-বাতাস উঠলে দৌড়ে গাছ জড়িয়ে ধরে থাকতাম, যেন ভেঙে না পড়ে। ধু ধু বালুচর এখন সবুজে ছেয়ে গেছে।

স্বীকৃতি ও পাকা সড়ক

গাছ লাগানোর সুবাদে এলাকায় একটি পাকা সড়কও পেয়েছেন কার্তিক। ২০০৩ সালের ২ ডিসেম্বর প্রথম আলোয় তাঁকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর তাঁর খবর ছড়িয়ে পড়ে। ২০০৭ সালে ঢাকায় তাঁকে কৃষি পদক দেওয়া হয়; সেখানে জানতে চাইলে তিনি ব্যক্তিগত কিছু না চেয়ে মনাকষা থেকে তাঁর বাড়ি পর্যন্ত সাত-আট কিলোমিটার কাঁচা সড়কটি পাকা করার অনুরোধ করেন, আর ওই বছরই সড়কটি পাকা করা হয়। ২০১৩ সালে অষ্টম শ্রেণির ইংরেজি পাঠ্যবইয়ে তাঁকে নিয়ে গল্প ছাপা হয়। কার্তিক বলেন, এই জীবনে আর কিছু চান না; যত দিন শরীর চলে গাছ লাগিয়ে যাবেন, আর ছোট ছেলেকে বলে রেখেছেন, তাঁর মৃত্যুর পর যেন গাছ লাগানো চালিয়ে যায়।

এই বিভাগের আরও খবর: সারাদেশ।

আরও পড়ুন: দুই শতকের থানার হাট: পটিয়ার গ্রামীণ বাণিজ্যের গল্প

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

এই প্রতিবেদনটি কেমন লাগল?

আপনার প্রতিক্রিয়া শুধু এই ব্রাউজারে সংরক্ষিত হবে।

আলোচনা

০ টি মতামত

এখনো কোনো মতামত নেই। প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

মতামত দিতে সাইন-ইন করুন।

সম্পর্কিত সংবাদ